মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

গ্রাম আদালত

গ্রাম আদালতের গঠন প্রক্রিয়া নিম্নরুপ :

 

১। গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান     -    ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান

২। বাদী পক্ষের ০২ জন শালিস    -    ০১ জন ইউ.পি মেম্বার

                             ০১ জন স্থানীয় গন্যমান্য ব্যাক্তি।

৩। বিবাদী পক্ষের ০২ জন শালিস   -    ০১ জন ইউ.পি মেম্বার

                             ০১ জন স্থানীয় গন্যমান্য ব্যাক্তি।

 

এ ইউনিয়নে অদ্যাবদি গ্রাম আদালতের মামলার সংখ্যা ও তার সর্ব শেষ অবস্থা নিম্মে আলোচনা করা হল :

 

 

২০১০ ইং সনে গ্রাম আদালতের মামলার সংখ্যা মোট ০৩ টি।

নিঃস্পত্তির সংখ্যা ০৩ টি।

স্থানীয় ভাবে সবকয়টি আপোষ মিমাংশা করা হইয়াছে।

 

 

২০১১ ইং সনে গ্রাম আদালতের মামলার সংখ্যা মোট ০৩ টি।

নিঃস্পত্তির সংখ্যা ০৩ টি।

স্থানীয় ভাবে আপোষ মিমাংশা করা হইয়াছে।

 

 

২০১২ ইং সনে গ্রাম আদালতের মামলার সংখ্যা মোট ০৩ টি।

নিঃস্পত্তির সংখ্যা ০৩ টি।

স্থানীয় ভাবে আপোষ মিমাংশা করা হইয়াছে।

 

 

২০১৩ ইং সনে গ্রাম আদালতের মামলার সংখ্যা মোট ০১ টি।

নিঃস্পত্তির সংখ্যা ০১ টি।

স্থানীয় ভাবে আপোষ মিমাংশা করা হইয়াছে।

 

 

গ্রাম আদালত নিয়ে বিস্তারিত তথ্য / আলোচনা


বিচার ব্যবস্থায় দেশের দরিদ্র মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত ও সহজ করতেই গঠন করা হয়েছে গ্রাম আদালত। গ্রামের দরিদ্র মানুষ যাতে সহজে ও নামমাত্র খরচে তাদের এই অধিকার রক্ষা বা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সেজন্যেই গ্রাম আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ আদালতে গ্রামের ছোটখাটো বিরোধ বড় আকার ধারণ করার আগেই সহজে নিষ্পত্তি করা সম্ভব । গ্রামীন জনপদে ন্যায়বিচারের ভিত শক্তিশালী করতে ২০০৬ সালে এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে গ্রাম আদালত প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ সরকার । ইউনিয়ন পর্যায়ের এই আদালত জজ আদালতে মামলার চাপ কমিয়ে গোটা বিচার ব্যবস্থায় গতিশীলতা এনেছে । তবে সাধারণ মানুষ ও তাদেরই নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা গ্রাম আদালত পরিচালিত হওয়ায় বা জনপ্রতিনিধিদের আচরণগত ত্রুটির কারণে এই আদালত অনেক সময় ভাবমূর্তি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় । কিন্তু আইনগত দিক থেকে গ্রাম আদালত একটি পূর্ণাঙ্গ আদালত।

গ্রাম আদালতের জরিমানা :
১৯৭৬ সালের গ্রাম আদালত আইন অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এটি ফৌজদারি ও দেওয়ানি দু’ধারাতেই বিচার করার কর্তৃত্ব রাখে।এক্ষেত্রে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের মূল্যমান ৫ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। ২০০৬ সালের মে মাসে ১৯ নং আইনের অধীনে ১৯৭৬ সালের গ্রাম আদালত অধ্যাদেশের সংশোধন হয়ে যে আইনটি প্রণীত হয়, সেটি কম-বেশি আগের আইনটির মতোই।তবে এখানে প্রধান পরিবর্তনটি এসেছে মামলার ক্ষতিপুরনের আর্থিক সীমায়, যা ৫ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়। ১৯৭৬ এবং ২০০৬ উভয় আইনেই এর গঠন, পরিচালনা, মামলা যাচাই-বাছাই, ডিক্রি জারি এবং কার্যবিবরণীর নথি সংরক্ষণের কাজগুলোকে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

যে সকল অভিযোগের বিচার গ্রাম আদালতে হয় না
ক) ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে
অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পূর্বে অন্য কোন আদালত কর্তৃক কোন আদালত গ্রাহ্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকে।

খ) দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে
• যখন কোন অপ্রাপ্ত বয়স্কের স্বার্থ জড়িত থাকে;
• বিবাদের পক্ষগণের মধ্যে বিদ্যমান কলহের ব্যাপারে কোন সালিশের ব্যবস্থা (সালিশি চুক্তি) করা হয়ে থাকলে;
• মামলায় সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা কার্যরত কোন সরকারি কর্মচারি হয়ে থাকলে;
*কোন অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রাম আদালতে কোন মামলা দায়ের করা যাবে না।

গ্রাম আদালতের মাধ্যমে গ্রামের দরিদ্র মানুষ জজ আদালতে জমে থাকা মামলার ঘানি এবং হয়রানির হাত থেকে মুক্তি পাবে। গ্রাম আদালত অধ্যাদেশ ও সালিসী আদালত অধ্যাদেশ অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে নির্দিষ্ট বিধি অনুযায়ী বিচার সম্পাদনের দায়িত্ব দিয়ে এ আদালত গঠন করা হয়েছে। ফলে শহরে না গিয়ে ঘরে বসেই গ্রাম আদালতের সুবিধা পাওয়া যায়। আদালত আইন-১৯৭৬ এবং সংশোধিত গ্রাম আদালত আইন ২০০৬ অনুযায়ী এই আদালতে ফৌজদারি ও দেওয়ানী উভয় ধরনের বিরোধ মিমাংসার সুবিধা পাবেন গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠি। যেমন:
• কম সময়ে ও নামমাত্র খরচে ন্যায্য বিচার পাওয়া;
• এ আদালতে উকিল নিয়োগের সুযোগ নেই বলে বিচার প্রক্রিয়ায় গরিব লোকেরা সহজে প্রবেশ করতে পারে;
• গ্রাম আদালতের বিচার পদ্ধতি আনুষ্ঠানিক হলেও মীমাংসা বন্ধুসুলভ হয়;
• গ্রাম আদালত আইনি পদ্ধতি হলেও বিবাদমান পক্ষসমূহ এটিকে সামাজিক সংগঠন মনে করে এবং গ্রাম আদালতের রায়কে সামাজিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করে;
• গ্রাম আদালতের রায়ের পরও বিবাদমান পক্ষদ্বয়ের মধ্যে সামাজিক বন্ধন অটুট থাকে যা ম্যাজিস্ট্রেট বা উচ্চ আদালতে মামলা চলাকালীন বা রায়ের পর বিদ্যমান থাকে না;
• গ্রাম আদালতের বিচারকগণ স্থানীয় হওয়ায় রায় বাস্তবায়ন করা সহজ হয়;
গ্রাম আদালতের আইনগত ভিত্তি থাকায় এই আদালতের রায় উচ্চ আদালতে গ্রহণযোগ্যতা পায়।

সরকারী এই সেবা পেতে একটি সাদা কাগজে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ জানাতে হয়।

গ্রাম আদালত কর্তৃক বিচারযোগ্য মামলার ক্ষেত্রে বিবাদের যে কোন পক্ষ বিচার চেয়ে গ্রাম আদালত গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট ৪ টাকা (দেওয়ানি মামলা হলে) অথবা ২ টাকা (ফৌজদারি মামলা হলে) ফি দিয়ে আবেদন করতে পারেন। আবেদনপত্রে যেসব বিবরণ থাকতে হবে-
১. যে ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করা হচ্ছে তার নাম;
২. আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;
৩. যে ইউনিয়নে অপরাধ ঘটেছে অথবা মামলার কারণের সৃষ্টি হয়েছে তার নাম;
৪. সংক্ষিপ্ত বিবরণাদিসহ অভিযোগ বা দাবির প্রকৃতি ও পরিমাণ;
৫. প্রার্থিত প্রতিকার;
৬. আবেদনকারী লিখিত আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করবেন; উল্লেখ্য, কোন অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আবেদন করা যাবে না। চেয়ারম্যান অভিযোগ অমূলক মনে করলে আবেদন নাকচ করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে নাকচের কারণ লিখে আবেদনপত্র আবেদনকারীকে ফেরত দিতে হবে।

অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তি ছাড়া সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সকলেই এই গ্রাম আদালতের সুবিধা পাবেন।

১ জন চেয়ারম্যান এবং বিবাদের প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দুজন সদস্য নিয়ে মোট ৫ জন সদস্য নিয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হয়। প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত ২ জন সদস্যের একজন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান হবেন। তবে যদি চেয়ারম্যান কোন কারণবশতঃ তার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন, কিংবা তার নিরপেক্ষতা সম্পর্কে আপত্তি ওঠে তাহলে পরিষদের অন্য কোন সদস্য আদালতের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করবেন। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন পক্ষ সদস্য মনোনয়ন দিতে ব্যর্থ হন তবে উক্ত মনোনয়ন ছাড়াই আদালত বৈধভাবে গঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। যদি কোন পক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের কোন সদস্যকে পক্ষপাতিত্বের কারণে মনোনীত করতে না পারেন তাহলে চেয়ারম্যানের অনুমতিক্রমে অন্য কোন ব্যক্তিকে মনোনীত করা যাবে।


বিচারের আবেদন করার পর বাদী এবং বিবাদী উভয়ইকে গ্রাম আদালতের দুজন বিচারক মনোনীত করতে হয়। মনোনীত সদস্যদের একজন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হবেন এবং অন্যজন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি হবেন ।


গ্রাম আদালতের রায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়। যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তার অনুপাত রায়ে অবশ্যই উল্লেখ করার বিধান রয়েছে। এবং আদালতের রায়ের পর ডিক্রি জারি হয়।
গ্রাম আদালতে সিদ্ধান্ত যদি সর্বসম্মত বা চার-এক (৪:১) ভোটে গৃহীত হয় বা চারজন সদস্যের উপস্থি'তিতে তিন-এক (৩:১) সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হয়, তাহলে উক্ত সিদ্ধান্ত পক্ষদ্বয়ের উপর বাধ্যতামূলক হবে এবং সেক্ষেত্রে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনরূপ আপিল চলবে না;
কোন কারনে গ্রাম আদালতের সেবা পাওয়া না গেলে-
• বিধান অনুযায়ী যদি তিন-দুই ভোটে কোন সিদ্ধান্ত হয় তবে সে সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক হবে না। সিন্ধান্ত ঘোষণার ত্রিশ দিনের মধ্যে যে কোন পক্ষ ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট (কগনিজেন্স আদালত) এবং দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে সহকারী জজ (মুন্সেফ)-এর আদালতে আপিল করতে পারবেন;
• গ্রাম আদালতের ডিক্রি বা ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের নির্দেশ ৬ মাসের অধিক হবে না।


গ্রাম আদালত অর্ডিনেন্স, ১৯৭৬ এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে পুনরায় বিচারকার্য সম্পাদনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। গ্রাম আদালত কর্তৃক ফৌজদারি বিচারযোগ্য ধারাগুলো হলো- দন্ডবিধির ১৬০, ৩২৩, ৩৩৪, ৩৪১, ৩৪২, ৩৫২, ৩৫৮, ৪২৬, ৫০৪, ৫০৬ (প্রথম অংশ), ৫০৮, ৫০৯ এবং ৫১০ ধারা। এ ছাড়াও ৩৭৯, ৩৮০, ৩৮১, ৪০৩, ৪০৬, ৪১৭, ৪২০, ৪২৭, ৪২৮, ৪২৯ (পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হলে) এবং ১৪১, ১৪৩, ১৪৭ গবাদী পশু সম্পর্কিত (আসামী দশ জনের নিচে হলে), ১৮৭১ এর ২৪/২৬/২৭ ধারা।
দেওয়ানি মামলাগুলো হলো- (১) কোনো চুক্তি বা অন্য কোন দলিল মুলে প্রাপ্য টাকা আদায়ের জন্য মামলা; (২) কোনো অস্থাবর সম্পত্তি বা উহার মূল্য আদায়ের মামলা; (৩) কোনো স্থাবর সম্পত্তি বেদখল হওয়ার এবং বছরের মধ্যে উহার দখল পুনরুদ্ধারের জন্য মামলা; (৪) কোনো অস্থাবর সম্পত্তি বেআইনিভাবে লওয়া বা বিনিষ্ট করার দরুণ ক্ষতি পূরণের মামলা; (৫) গবাদী পশুর অনাধিকার প্রবেশের দরুণ ক্ষতি পূরণের মামলা এবং (৬) কৃষি শ্রমিকের পরিশোধযোগ্য মজুরী ও ক্ষতি পূরণের মামলা (উপরেল্লিখিত মামলা সমূহের যখন স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির মূল্যমান ২৫,০০০/- টাকা বা তার কম হবে)।

 

 

সামাজিক সুবিচার এবং গ্রাম-আদালতহতদরিদ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে স্বল্প খরচে ন্যায়বিচারের সুফল পৌঁছে দিতে 'গ্রাম-আদালতের' প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা হয়েছিল সেই ১৯৭৬ সালেই। অকার্যকর এই ব্যবস্থাটিতে গতি আনতে সংশ্লিষ্ট আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে ২০০৬ সালে। তারপরও গ্রাম-আদালত কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারছে না। গ্রাম-আদালত সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা এবং আদালতে দায়িত্বরত বিচারকদের দক্ষতার অভাবের কারণে গ্রাম আদালত এখনো তেমন একটা কার্যকর নয়। এ নিয়েই লিখেছেন উমর ফাঈলাসূফ
এ ধরনের ফতোয়াভিত্তিক সালিশি বিচার ঠেকাতে গ্রাম আদালত ভূমিকা রাখতে পারেস্বাধীনতার অব্যবহিত পরে যখন আমাদের দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থা শৈশবকাল পার করছে তখন থেকেই আইন প্রণেতারা অনুধাবন করতে শুরু করেন যে, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতে হলে শুধু প্রচলিত দেওয়ানি আর ফৌজদারি আদালতগুলোই যথেষ্ট নয়, বরং এর সঙ্গে এমন একটি বিচারকাঠামো দরকার- যার মাধ্যমে স্বল্প সময় আর অর্থ ব্যয় করে ছোটো-খাটো বিবাদের মীমাংসা করা সম্ভব। এই ধারণাকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে প্রণীত হয় 'গ্রাম আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৭৬'। এর মাধ্যমে গ্রামে বহু আগ থেকে প্রচলিত 'সালিশ ব্যবস্থা'কে ঢেলে সাজিয়ে একটি স্বতন্ত্র বিচার কাঠামোতে রূপদান করা হয়। পরবর্তীতে সামান্য কিছু সংশোধনের পর ২০০৬ সালে এই অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপান্তরিত করা হয়, 'গ্রাম আদালত আইন' নামে। ইউনিয়ন পর্যায়ের এই আদালত জজ আদালতগুলোতে মামলার চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ফলে বিচারব্যবস্থাতেও গতিশীলতা আসছে।
আইন অনুযায়ী পাঁচজন সদস্য নিয়ে গঠিত গ্রাম-আদালত একটি পূর্ণাঙ্গ আদালত। বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষ থেকে একজন করে স্থানীয় মুরুবি্ব এবং একজন করে ইউপি সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানকে নিয়ে এই আদালত গঠিত হয়। আদালতের নিরপেক্ষতা নিয়ে যদি কোনো পক্ষের সংশয় বা অনাস্থা থাকে তাহলে যথাযথ কারণ দেখিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে অথবা ইউএনও অফিসে আবেদন করা যাবে। এখানে কোনো পক্ষ থেকেই আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ নেই। সর্বোচ্চ পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে এই আদালতকে।
দেওয়ানি ও ফৌজদারির বিশেষ বিশেষ কিছু ধারার মামলা বিচারের এখতিয়ার দেয়া হয়েছে গ্রাম আদালতকে। ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে গ্রাম আদালতের এখতিয়ারভুক্ত ধারাগুলো হলো দ-বিধির ১৬০, ৩২৩, ৩৩৪, ৩৪১, ৩৪২, ৩৫২, ৩৫৮, ৪২৬, ৫০৪, ৫০৬ (প্রথম অংশ), ৫০৮, ৫০৯ এবং ৫১০ ধারা। এছাড়া ৩৭৯, ৩৮০, ৩৮১, ৪০৩, ৪০৬, ৪১৭, ৪২০, ৪২৭, ৪২৮, ৪২৯ (যদি ক্ষতির পরিমাণ অনধিক পঁচিশ হাজার টাকা হয়) এবং ১৪১, ১৪৩, ১৪৭ গবাদিপশু সম্পর্কিত (আসামি অনধিক দশ জন হলে)। দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে- চুক্তি বা দলিলমূলে প্রাপ্য টাকা আদায়, কোনো অস্থাবর সম্পত্তি বিনষ্ট করা অথবা মূল্য আদায়, স্থাবর সম্পত্তির দখল পুনরুদ্ধার, গবাদি পশুর অনধিকার প্রবেশের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং কৃষি শ্রমিকের মজুরি সংক্রান্ত মামলাসমূহের বিচার গ্রাম আদালতে করা সম্ভব। তবে শর্ত হচ্ছে, সেই স্থাবর বা অস্থাবর জমির মূল্যমান অবশ্যই পঁচিশ হাজার টাকার নিচে হতে হবে।
বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মামলার বিচার গ্রাম-আদালতে হয় না। যেমন ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পূর্বে অন্য কোনো আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়। কিংবা দেওয়ানি মামলায় যদি অপ্রাপ্তবয়স্কের স্বার্থ জড়িত থাকে, দুই পক্ষের ভেতর আগে সালিশি চুক্তি হয়ে থাকলে, মামলাটিতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন বা কর্মরত সরকারি কর্মচারী পক্ষভুক্ত হলে। এসব ক্ষেত্রে অপরাধের বিচার প্রচলিত নিয়মে জজ আদালতে হবে। এছাড়া অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগ এই আদালত গ্রহণ করতে পারবে না।
গ্রাম আদালতে বিচার পেতে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর দরখাস্ত লিখতে হয়। দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে ৪ টাকা এবং ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে ২ টাকা ফি দিয়ে বিবদমান যে কোনো পক্ষ চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে পারে। সেই দরখাস্তে ইউনিয়ন পরিষদের নাম, আবেদনকারীর নাম ও পরিচয়, অভিযোগ এবং তার প্রার্থিত প্রতিকার সুনির্দিষ্টভাবে লিখতে হয়। দরখাস্ত পাওয়ার পর চেয়ারম্যান উপরে উলি্লখিত নিয়মে পাঁচজন সদস্যের আদালত গঠন করবেন। এরপর পক্ষদ্বয়ের শুনানি এবং অন্যান্য বিচার প্রক্রিয়া শেষে প্রকাশ্যে রায় প্রদান করা হবে। রায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুপাত উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা আছে। গ্রাম আদালতে রায় ঘোষণার ত্রিশ দিনের মধ্যে যে কোনো পক্ষ, ফৌজদারি মামলা হলে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট এবং দেওয়ানি মামলা হলে সহকারী জজ আদালতে আপিল করতে পারবেন।
গ্রাম-আদালতের ধারণাটি অত্যন্ত চমৎকার হলেও আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত এই আদালতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা খুব একটা শরণাপন্ন হচ্ছেন না। গ্রাম-আদালত সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না রাখা এবং বিচারিক কার্যক্রম ও আইন বিষয়ে এই আদালতের বিচারকদের জ্ঞানের স্বল্পতা গ্রাম-আদালতকে এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত মানে উপনীত করতে পারে নি। সরকারি-বেসরকারিভাবে গ্রাম-আদালত সম্পর্কে গ্রামীণ অঞ্চলে তাই যথেষ্ট প্রচারণা চালালে এই আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা আসতে পারে। অন্যদিকে গ্রাম-আদালতে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ ব্যক্তিদের যথাযথ আইনি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। নয়তো বিচারপ্রার্থীরা উল্টো রায় পেতে পারেন এবং আদালতের প্রতি তাদের অনীহা তৈরি হতে পারে।
যদিও গ্রাম আদালতের কার্যক্রম এখনো আমাদের দেশে তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে প্রসারিত হচ্ছে, তারপরও যে আইনবলে একে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে তার পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক এবং সুদূরপ্রসারী। তাই কম খরচে এবং কম সময়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে ন্যায় বিচার পৌঁছে দেয়ার যে মহান অভিপ্রায় নিয়ে এই আদালত গঠিত হয়েছে, তাতে অভীষ্ট হতে হলে অবশ্যই তৃণমূল পর্যায়ে গ্রাম আদালতের কার্যক্রমের প্রচার এবং এর ক্ষমতার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
 
 
 

মামলা জট কমাতে গ্রাম আদালত ভূমিকা রাখতে পারে ॥ # সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে # অর্থনৈতিক সাশ্রয় হবে # গ্রাম আদালতের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব


 

পদ্মকলি :
দেশের নিম্ন আদালত ও উচ্চ আদালতের মামলা জট কমাতে স্থানীয় সরকারের অধীনে পরিচালিত গ্রাম আদালত ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রাম আদালতের মাধ্যমে সাধারণ মামলাসমূহ পরিচালনা করলে একদিকে যেমন মামলা জট কমবে অন্যদিকে ভিকটিমের অর্থনৈতিক সাশ্রয় হবে। ভিকটিমের সাংসারিক বৈষম্য ফিরে আসবে। অভিজ্ঞমহল মনে করছেন স্থানীয় সরকাকে শক্তিশালী ও কার্যকর করণের মাধ্যমে গ্রাম আদালতকে অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে সচল রাখতে হবে।
স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে গ্রাম আদালতের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছেন স্থানীয় সরকার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. তোফায়েল আহমেদ। ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, সরকার গ্রাম আদালতকে সচল করলে নির্বাহী ও বিচার বিভাগের ছন্দপতন ঘটবে। কারণ ইতিমধ্যে বিচারবিভাগকে পৃথক করা হয়েছে। কোন ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে দিয়ে গ্রাম আদালত পরিচালনা করা সঠিকভাবে সম্ভব হবেনা। তাদের সালিশের ক্ষমতা দিতে হবে। গ্রাম আদালতকে শক্তিশালী করা ঠিক হবেনা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশে মামলা জটের অন্যতম একটি কারণ হলো আইনজীবীরা। তারা একটি মামলাকে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করে থাকেন। গ্রাম আদালতের বিষয়ে তিনি আরো বলেন, এটিকে সংশোধনের মাধ্যমে সালিশে পরিনত করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষধের চেয়ারম্যানদেরকে সালিশ ব্যবস্থায় বিচার কাজ পরিচালনা করার ক্ষমতা দিতে হবে। গ্রাম আদালতের নাম পরিবর্তণ করে উপজেলা পর্যায়ে আদালত চালু করতে হবে।

স্থানীয় সরকারেকে কার্যকর ও শক্তিশালীকরণে ম্যাস লাইন মিডিয়া সেন্টার কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ম্যাস লাইন মিডিয়া সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক কামারুল হাসান মঞ্জু। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারকে অবশ্যই শক্তিশালী করতে হবে। তা না হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। গ্রাম আদালত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এতে কেন্দ্রীয় সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাছাড়া মিডিয়ার সঙ্গে স্থানীয় সরকারের বেশ দুরত্ব রয়েছে। এ দুরত্ব কমাতে হবে। তবেই স্থানীয় সরকারের অধীনে শুধু গ্রাম আদালত নয় সকল বিভাগকেই শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।

বিশিষ্ঠ আইনজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, স্থানীয় সরকারের অধীনে গ্রাম আদালত আইন ১৯৭৬ সালে পাশ হয়। পরে এটি সংশোধন আকারে আবারো ২০০৬ সালে পাশ করা হয়েছে। গ্রাম আদালতের সুফল কয়েক বছর কাজ না পাওয়া গেলে এটাতে সুবিচার পাওয়া যাবে কিনা বলা যাবে না। এই মূহুর্তে এটি বলা বেশ কঠিন। কয়েক বছর কাজ করলে এটিকে মূল্যায়ন করা যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিচারবিভাগ পৃথকীকরণের ফলে বিচার বিভাগের সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় প্রতিনিধিরা সাধারণ অভিযোগের বিচার পরিচালনা করতে পারবেন। সব বিচার যে বিচারকদের করতে হবে তা কোন কথা নয়। প্রয়োজনে বিরোধ নিষ্পত্ত্বিতে স্থানীয় প্রতিনিধিরাও এর সমাধান করতে পারবেন। এতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের সঙ্গে এর কোন প্রভাব পড়বে না। কারণ স্থানীয় প্রতিনিধিরা জটিল কোন মামলা পরিচালনা করেন না। তাই এটি সাংঘর্ষিক ওই অর্থে বলা যায়না।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শ ম রেজাউল করীম বলেন,  স্থানীয় সরকারকে অবশ্যই শক্তিশালী করা দরকার। কারণ একটি দেশের ইউনিয়ন পরিষদ যত বেশী শক্তিশালী হবে সে অঞ্চলের ততবেশী উন্নয়ন হবে। আর গ্রাম আদালতের বিষয়টি আসলেই থমকে আছে। এটি শক্তিশালী ও কার্যকর করা জরুরী। এটি কার্যকর হলে একদিকে সাধারণ মানুষের দূর্ভোগ যেমন কমে আসবে অন্যদিকে আদালতগুলো থেকে মামলা জট হ্রাস পাবে। তাই গ্রাম আদালতকে যতদ্রুত সম্ভব কার্যকরী করতে হবে।